ETV Bharat / bharat

'আমাদের পরিচিতি যেদিন মুছেছিলেন...', 370 ধারা অবলুপ্তির দিনেই প্রয়াত সত্যপাল

জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা লোপের সময় রাজ্যপাল ছিলেন সত্যপাল মালিক ৷ প্রধানমন্ত্রী মোদির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বিতর্কেও জড়িয়েছিলেন ৷ সিবিআই তাঁর বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ করে ৷

former jammu kashmir governor Satyapal Malik
প্রয়াত জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন রাজ্যপাল সত্যপাল মালিক (ছবি: পিটিআই)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : August 5, 2025 at 7:43 PM IST

6 Min Read
Choose ETV Bharat

নয়াদিল্লি, 5 অগস্ট: একেই বলে সমাপতন ! মঙ্গলবার জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা অবলুপ্তির ষষ্ঠ বর্ষপূর্তি ৷ এদিনই প্রয়াত হলেন পূর্বতন রাজ্যটির শেষ রাজ্যপাল সত্যপাল মালিক ৷ বেলা 1.12 মিনিটে রাজধানীর রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি ৷ 79 বছর বয়সি এই নেতা দীর্ঘদিন ধরে কিডনির অসুখে ভুগছিলেন ৷ চিকিৎসাধীন ছিলেন হাসপাতালের আইসিইউতে ৷ আরএমএল হাসপাতাল থেকে একটি বিবৃতিতে তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশ করা হয় ৷

জম্মু-কাশ্মীর ছাড়াও প্রবীণ রাজনীতিক সত্যপাল মালিক গোয়া, বিহার, মেঘালয় ও ওড়িশার রাজ্য়পালের দায়িত্বভার সামলেছিলেন ৷ তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে লোকসভা ও রাজ্যসভার সাংসদও হয়েছেন ৷ তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ৷ সোশাল মিডিয়ায় সংক্ষিপ্ত বার্তায় তিনি লিখেছেন, " সত্যপাল মালিকের মৃত্যুর খবরে আমি শোকাহত ৷ এই দুঃখের সময়ে তাঁর পরিবার ও অনুগামীদের প্রতি আমার সমবেদনা রইল ৷ ওম শান্তি ৷"

অর্থবহ পোস্ট করেছেন জম্মু-কাশ্মীরের শাসকদল ন্যাশনাল কনফারেন্সের মুখপাত্র তথা বিধায়ক তনভীর সাদিক ৷ সোশাল মিডিয়ায় তিনি লেখেন, "যে দিনটি তিনি (সত্যপাল মালিক) আমাদের পরিচয় মুছে দেওয়ার জন্য বেছে নিয়েছিলেন, সেদিনই তিনি নিজের যাত্রা শেষ করলেন ৷ এটা যদি পোয়েটিক জাস্টিস না হয়, তাহলে আর কী হতে পারে ?"

2018 সালের 23 অগস্ট থেকে 2019 সালের 2 নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে সত্যপাল মালিক জম্মু-কাশ্মীরের রাজ্যপাল ছিলেন ৷ ঠিক ছ'বছর আগে এই দিনে অর্থাৎ 2019 সালের 5 অগস্ট তিনি রাজ্যপাল থাকাকালীন জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যের বিশেষ মর্যাদা অবলুপ্তি ঘটায় কেন্দ্রের এনডিএ সরকার ৷ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ওই দিন রাজ্যসভায় সংবিধানের 370 ও 35এ ধারার অবলুপ্তির ঘোষণা করেন ৷ এদিকে এই ঘটনার ছ'বছর পূর্তি দিনেই তাঁর মৃত্যু হল ৷

বিতর্কে সত্যপাল মালিক

মোদি সরকারের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মন্তব্য করে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন সত্যপাল ৷ একটি সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, জম্মু-কাশ্মীরের রাজ্যপাল থাকাকালীন তাঁকে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল ৷ পূর্বতন রাজ্যটির দু'টি গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের ফাইলে ছাড়পত্র দিতে তাঁকে ঘুষের প্রস্তাব দেওয়া হয় ৷

এছাড়া 2019 সালের 14 ফেব্রুয়ারি পুলওয়ামায় সিআরপিএফ জওয়ানদের গাড়িতে জঙ্গি হামলার ঘটনা নিয়ে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে তিনি গুরুতর অভিযোগ তোলেন ৷ ওই সাক্ষাৎকারে সত্যপাল দাবি করেন, উনিশের লোকসভা নির্বাচনের আগে পুলওয়ামা হামলার ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের গাফিলতি স্পষ্ট ছিল ! সেকথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালকে তিনি জানিয়েছিলেন ৷ কিন্তু, তাঁরা দু'জনই তাঁকে 'চুপ' করে থাকতে বলেন ! ওই হামলায় 40 জন জওয়ানের মৃত্যু হয় ৷

সাক্ষাৎকারে সত্যপালের বিস্ফোরক দাবি, কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের গন্তব্য়ে পৌঁছে দিতে পাঁচটি বিমান চেয়েছিল সিআরপিএফ ৷ কিন্তু, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সেই আবেদন খারিজ করে দেয় ! শুধু তাই নয়, বারুদবোঝাই জঙ্গিদের যে ট্রাক ওই আধাসেনার কনভয়ে হামলা চালিয়েছিল, ঘটনার আগে পর্যন্ত কয়েকদিন ধরে সেটি উপত্যকায় নানা পথে টহল দিয়েছিল ! অথচ, প্রশাসনের কাছে সেই সংক্রান্ত কোনও খবরই ছিল না ! এমনকী, যে রাস্তা দিয়ে সেনার কনভয় যাচ্ছিল তার সঙ্গে সংযুক্ত ছোট রাস্তাগুলিকে ব্যারিকেড পর্যন্ত করা হয়নি ! এই ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের গাফিলতি পরিষ্কার, জানিয়েছিলেন সত্যপাল ৷ তিনি বিজেপি সরকারের তিনটি কৃষি আইনেরও প্রবল সমালোচনা করেছিলেন ৷

এদিকে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলার পর 2024 সালে ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত শুরু করে সিবিআই ৷ প্রাক্তন রাজ্যপালের বাড়ি-সহ 29টি জায়গায় তল্লাশি চালান কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকরা ৷ তাঁরা জানান, 2 হাজার 200 কোটি টাকার কিরু জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে এই তল্লাশি ৷ জম্মু-কাশ্মীরের ডোডা জেলায় কিস্তওয়ার তেহসিলে চন্দ্রভাগা নদীর উপর এই কিরু জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে উঠেছে ৷ চলতি বছরের মে মাসে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের দুর্নীতিতে সত্যপালের বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ করে সিবিআই ৷

হাসপাতাল সূত্রে খবর, চলতি বছরের 11 মে মূত্রাশয়ে সংক্রমণের (ইউটিআই) কারণে আরএমএল হাসপাতালে ভর্তি হন সত্যপাল মালিক ৷ পরে তাঁর ডায়ালিসিস হয় ৷ কিন্তু শারীরিক অবস্থার ক্রমশ অবনতি হতে থাকে ৷ তিনি হাসপাতালে থাকাকালীন 22 মে সিবিআই কিরু জলবিদ্যুৎ প্রকল্প দুর্নীতি মামলায় উপত্যকার প্রাক্তন রাজ্যপালের বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ করে ৷

রাজনৈতিক জীবন

গত শতকের ছ'য়ের দশকে রাম মনোহর লোহিয়ার সমাজবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ সেদিনের তরুণ সত্যপাল মালিকের ৷ 1966 থেকে 1967 সাল তিনি মেরঠ কলেজ ছাত্র সংসদের সভাপতি পদে ছিলেন ৷ 1968-69 সালে তিনি তৎকালীন মেরঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের (বর্তমানে চৌধরী চরণ সিং বিশ্ববিদ্যালয়) ছাত্র সংসদের সভাপতি নির্বাচিত হন ৷

পরে তিনি ভারতীয় ক্রান্তি দলে যোগ দেন ৷ 1974 সালে প্রথম বার উত্তরপ্রদেশের বাঘপত বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ভোটে লড়েন এবং জয়ী হন ৷ পরে বিধানসভায় দলের মুখ্য সচেতক নির্বাচিত হন ৷ 1975 সালে নতুন রাজনৈতিক দল 'লোক দল'-এর সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান ৷ 1980 সালে দল তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠায় ৷

পরে 1984 সালে কংগ্রেসে যোগ দেন সত্যপাল ৷ দু'বছর পর 1986 সালে তাঁকে রাজ্যসভার প্রার্থী হিসাবে নির্বাচিত করে কংগ্রেস ৷ পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশের কংগ্রেস কমিটির সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন ৷ কিন্তু মাত্র তিন বছরেই কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্কে ভাঙন ধরে ৷ 1987 সালে রাজ্যসভা থেকে ইস্তফা দেন সত্যপাল ৷ পাশাপাশি কংগ্রেসের সদস্য হিসাবেও পদত্যাগ করেন ৷

নিজেই 'জন মোর্চা' নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন ৷ কিন্তু এক বছর পর 1988 সালেই তাঁর দল জনতা দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় ৷ বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের সঙ্গে সারা দেশে ঘুরে ঘুরে বহু জনসভায় বক্তৃতা করেন সত্যপাল মালিক ৷ 1987 থেকে 1991 সাল পর্যন্ত 'জনতা দল'-এর সম্পাদক ও মুখপাত্র ছিলেন সত্যপাল মালিক ৷

এর মধ্যে 1989 সালে জনতা দলের টিকিটে আলিগড় লোকসভা থেকে প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে লড়ে জয়ী হন তিনি ৷ পরে 2004 সালে অটল বিহারী বাজপেয়ির সময়ে বিজেপিতে যোগ দেন মালিক ৷ বাঘপত লোকসভা থেকে নির্বাচনে লড়েন ৷ কিন্তু সেবার আরএলডি প্রধান অজিত সিংয়ের কাছে পরাজিত হন ৷ 2005-06 সালে তিনি উত্তরপ্রদেশ বিজেপির সহ-সভাপতি হন ৷ 2009 সালে বিজেপির কিষাণ মোর্চার সর্বভারতীয় দায়িত্ব পান ৷ 2012 সালে বিজেপি জাতীয় সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন সত্যপাল ৷ মোদি জমানায় একাধিক রাজ্যের রাজ্যপালের পদে ছিলেন সত্যপাল মালিক ৷