এখনও সতেজ এনকাউন্টার, মাওবাদীদের রক্ত, ধোঁয়ার গন্ধে ভারী অবুঝমাড়ের বাতাস
ছত্তিশগড়ের অবুঝমাড় জঙ্গলের ভিতরে মাওবাদী নিকেশ অভিযান চালায় নিরাপত্তাবাহিনী ৷ দেশের অন্যতম বৃহৎ এই অভিযান স্থলে পৌঁছল ইটিভি ভারতের দল ৷

Published : May 25, 2025 at 9:09 PM IST
নারায়ণপুর, 25 মে: ঘন জঙ্গলের মধ্যে কোথাও পড়ে রয়েছে বুলেট, কোথাও মাওবাদী সাহিত্যের ছেঁড়া পাতা ৷ বাঁশ গাছের গায়ে টাটকা গুলির ক্ষত ৷ আর সর্বোপরি তাজা গ্রেনেড, যা যে কোনও মুহূর্তে বিস্ফোরণ হতে পারে ৷ এটাই ছত্তিশগড়ের বিশাল অবুঝমাড়ের ঘন জঙ্গলের গভীরে এনকাউন্টার স্থল ৷ গত 21 মে এখানেই অন্যতম বড় মাওবাদী নিকেশ অভিযান চালিয়েছিল নিরাপত্তাবাহিনী ৷
এরপর ইটিভি ভারতের একটি দল সেই দুর্গম জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল ৷ সেই দৃশ্য ক্যামেরা বন্দি করেছে তারা ৷ ওই জঙ্গলে এখনও ছড়িয়ে মাওবাদীদের প্রতিদিনের ব্যবহার্য জিনিসপত্র- খাবারের প্যাকেট, ভেসলিন, ওষুধ আর জলের বোতল ৷ জঙ্গলে গেরিলা যুদ্ধে খুবই গুরুত্বপূর্ণ জুতো ৷ সেই জুতোগুলি এখনও মাওবাদীদের চিহ্ন বয়ে চলেছে ৷ চারদিকে কটূ গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসার জোগাড় ৷ মাওবাদীদের রক্ত ধুয়ে গিয়েছে বৃষ্টির জলে ৷ সেই রক্তের গন্ধে ভরেছে গাছ, পাতা, ঘাস, অবুঝমাড়ের আকাশ-বাতাস ৷
দীর্ঘ সময় ধরেই অবুঝমাড় নকশালদের নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠেছিল ৷ গত 21 মে নিরাপত্তাবাহিনীর অভিযানে হাই-প্রোফাইল মাওবাদী নেতা তথা সাধারণ সম্পাদক নামবাল্লা কেশব রাও ওরফে বাসবরাজু-সহ-27 জন মাওবাদীর মৃত্যু হয় ৷ বাসবরাজুর মাথার দাম উঠেছিল এক কোটি টাকা ৷ তাই এই অভিযানের সাফল্যের গুরুত্বই অন্যরকম ৷
এই অভিযান চালিয়েছিল নারায়ণপুর, কোন্দাগাঁও, দান্তেওয়াড়া, বিজাপুর জেলার ডিস্ট্রিক্ট রিজার্ভ গার্ড (ডিআরজি) একসঙ্গে ৷ মাওবাদী এনকাউন্টারে দু'জন ডিআরজি জওয়ানের মৃত্যু হয় আইইডি বিস্ফোরণে ৷

এনকাউন্টারের জায়গায় পৌঁছনো খুব সহজ ছিল না ৷ সরু আঁকা-বাঁকা রাস্তায় শুধু একটা দু'চাকা যেতে পারে অথবা হেঁটে যাওয়া যায় ৷ এই রাস্তা ধরে হাঁটলে মিলবে বিনাগুন্ডার ঘন জঙ্গল ৷ এখানেই অন্যতম বড় অভিযানটি হয়েছিল ৷ দশ ঘণ্টারও বেশি সময়ের যাত্রাপথ পেরিয়ে ইটিভি ভারত সেই ঘন জঙ্গল ঘেরা এলাকায় পৌঁছতে পেরেছিল ৷ নদী বা ছোট জলাশয় পারাপারে গ্রামবাসীদের তৈরি কাঠের সাঁকোই ভরসা ছিল ৷ এর সঙ্গে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার শুধু হাঁটতে হয়েছে ৷
সূর্য ডুবলেই এখানে আঁধার নেমে আসে ৷ তখন গ্রামের বাড়িগুলির ছাদে বসানো সোলার প্যানেল থেকে আলো পাওয়া যায় ৷ এই অঞ্চলে আধুনিকতার ছোঁয়া বলতে এই সোলার প্য়ানেল ৷ ঘরগুলি কিন্তু মাটি দিয়ে তৈরি ৷ আর ছাউনি বলতে খড়ের গাদা ৷
যে জায়গাটিতে মাওবাদী নিকেশ এনকাউন্টার হয়েছিল, সেটি অবুঝমাড়ের বোটের গ্রাম থেকে চার ঘণ্টার দূরে কালেকোট জঙ্গলে অবস্থিত ৷ গুন্ডাকোট থেকেও একই সময় লাগে এখানে পৌঁছতে ৷ দীর্ঘ সময় এখানে নিরাপদে দিনের পর দিন কাটিয়েছে মাওবাদীরা ৷ সাধারণ মানুষের পক্ষে খাড়া পাহাড় টপকে এখানে পৌঁছনো প্রায় অসম্ভব ৷ তাছাড়া ভাল্লুক এবং চিতাবাঘের মতো বন্যপ্রাণীদের প্রায়শ নদী, জঙ্গলের ধারে ঘুরতে দেখা যায় ৷
অবুঝমাড়ের জঙ্গল যে মাওবাদীদের স্বর্গরাজ্য, সেই মিথ কিন্তু ভেঙে দিয়েছে 21 তারিখের অভিযান ৷ মাওবাদীদের মানচিত্রটাই ধ্বংস করে দিয়েছে নিরাপত্তাবাহিনী ৷ নারায়ণপুর জেলায় ইটিভি ভারতের সদর কার্যালয় থেকে 65 কিমি পথ পেরিয়ে ইটিভি ভারতের দল পৌঁছয় ওরচায় ৷ এটাই অবুঝমাড়ের সদর ব্লক ৷ সেখান থেকে 30 কিমি এবড়ো-খেবড়ো দুর্গম রাস্তা ধরে বোটের গ্রামে পৌঁছন তাঁরা ৷ এরপর শুধু হেঁটে এই গুন্ডাকোটে যাওয়াটা একটা কঠিন যাত্রা ছিল ৷
গুন্ডাকোট গ্রামে একটা রাত কাটিয়ে ইটিভি ভারতের দল ফের চলতে শুরু করে ৷ এবার তারা পৌঁছয় এনকাউন্টারের জায়গাটিতে ৷ মাঝে পেরতে হয়েছে একের পর এক নদী, পাহাড় ৷ যেখানে হিংস্র বন্যপ্রাণীদের আনাগোনা খুব স্বাভাবিক একটা ঘটনা ৷ গ্রামবাসীরাই বাতলে দিয়েছিল, চার কিমি যেতে পারলেই ঠিক এনকাউন্টারের জায়গায় পৌঁছনো যাবে ৷ সেই অনুযায়ী চলে শেষমেশ অভিযান স্থলে এসে পৌঁছয় ইটিভি ভারতের দলটি ৷
এই অভিযানের আগের রাতে নিরাপত্তাবাহিনী যেখানে কাটিয়েছিল, সেখানেই প্রথমে যায় ইটিভি ভারত ৷ সেখানে তখনও পড়ে রয়েছে খাবারের ছেঁড়া প্যাকেট, ইলেকট্রল পাউডারের স্যাচেট এবং লাল ফ্লুরোসেন্ট রঙের রিবন ৷ রাতে ঘন অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যে এই লাল রিবন দিয়েই তো একে অপরকে চিনতে পারত মাওবাদীরা ৷
এরপর ইটিভি ভারতের দল আহত সেনাদের যেখানে রাখা হয়েছিল, সেই জায়গায় ৷ সেখান থেকে সোজা এনকাউন্টারের জায়গায় ৷ স্থানীয়রা জানালেন, মৃত মাওবাদীদের দেহগুলি চপার দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ৷ এদিকে এই পরিস্থিতিতে বিনাগুন্ডার কাছে অবস্থিত গুন্ডাকোটের বাসিন্দারা বোটের গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে ৷ এনকাউন্টার শুরুর পর তাঁরা নিরাপদ জায়গায় চলে যান ৷ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এই অভিযানকে মাওবাদী নিকেশ যুদ্ধে একটা মাইলফলক বলে উল্লেখ করেছেন ৷

