কুকুরের কামড়ে দেশের পরিস্থিতি 'ভয়াবহ', সুপ্রিম নির্দেশের পরই প্রকাশ্যে পরিসংখ্যান
পথকুকুরদের সরাতে হবে ৷ শীর্ষ আদালতের নির্দেশের পরই দেশজুড়ে চর্চা তুঙ্গে ৷ কিন্তু দেশে পথকুকুরের পরিস্থিতি কী ? ইটিভি ভারতের প্রতিবেদনে জানুন বিস্তারিত ৷

Published : August 13, 2025 at 7:28 PM IST
হায়দরাবাদ, 13 অগস্ট: রাজধানীতে পথকুকুরের কামড়ের আতঙ্ক ঘিরে একদিন আগেই বড় নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। অবিলম্বে দিল্লি ও সংলগ্ন এলাকার সব পথকুকুরকে লোকালয় থেকে সরানোর নির্দেশ দেওয়া হয় ৷ সোমবারের ওই নির্দেশের পর থেকেই চর্চা শুরু হয়েছে দেশজুড়ে। এই আবহে বুধবার দেশের প্রধান বিচারপতি বিআর গবাই আশ্বাস দেন, বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখবেন ৷ এমন পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে পথকুকুরদের পরিস্থিতি কী ? পরিসংখ্যান তুলে ধরল ইটিভি ভারত ৷
উল্লেখ্য, দেশের শীর্ষ আদালত গত পরশু নির্দেশ দেয়, দিল্লির রাস্তা থেকে কুকুরদের সরিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠাতে হবে ৷ সোমবারের সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া নির্দেশে আরও জানানো হয়, কোনও পশুপ্রেমী বা সংস্থা পথকুকুরদের সরানোর নির্দেশের বিরোধিতা করলে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে ৷ কেন্দ্র ছাড়া এই মামলায় অন্য কারও আবেদন শুনবে না বলেও জানিয়ে দেয় শীর্ষ আদালত। এরপরই আদালতের এই পদক্ষেপে ক্ষোভপ্রকাশ করেন পশুপ্রেমীরা ৷ খোদ প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মানেকা গান্ধি থেকে শুরু করে অনেকে আদালতের নির্দেশকে 'অযৌক্তিক' বলে অভিহিত করেছেন।

বুধে সুপ্রিম কোর্টের আশ্বাস-
একটি সংস্থার তরফে এক আইনজীবী শীর্ষ আদালতে বিষয়টি উল্লেখ করেন ৷ সুপ্রিম কোর্টের অন্য একটি বেঞ্চে 2024 সালে এই সংক্রান্ত একটি মামলা হয়েছিল ৷ সেখানে বিচারপতি কী বলেছিলেন তা এদিন আদালতে তুলে ধরেন ওই আইনজীবী ৷ এরপরই প্রধান বিচারপতি জানান,অন্য একটি বেঞ্চ ইতিমধ্যেই পথকুকুর সংক্রান্ত একটি নির্দেশ জারি করেছে। বিষয়টি তিনিও খতিয়ে দেখবেন।

আশ্রয়কেন্দ্রই কি সমাধান ?
- অনেকেরই প্রশ্ন, ভারতে কুকুরের কামড় বা জলাতঙ্ক কমানোর সমাধান কি কেবল আশ্রয়কেন্দ্রই ? সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর, আশ্রয়স্থলের সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে ৷ পাশাপাশি এই কেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণের অর্থ এবং কুকুরদের দেখাশোনার খরচ ও কর্মীদের বেতন কোথা থেকে আসবে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে ৷
- গত পরশু শীর্ষ আদালত নির্দেশ দিয়েছে, 5000 কুকুরের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা হবে ৷ সেখানে কুকুরদের নির্বীজকরণের জন্য় সমস্ত চিকিৎসা করা হবে ৷ কিন্তু অনেকেই মনে করছেন সংখ্যাটা পর্যাপ্ত নয় ৷ অ্যানিমাল হাজবেন্ডারি দফতরের (দিল্লি) দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানীতে পথকুকুরের সংখ্যা প্রায় 55,000 ৷ অর্থাৎ, শীর্ষ আদালত যা নির্দেশ দিয়েছে তাতে দিল্লির পথকুকুরদের মাত্র 10 শতাংশকে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব হবে ৷ তাই প্রশ্ন উঠছে, পথকুকুরদের দেখাশোনা করার দায়িত্ব কার ? পথকুকুর ও মানুষের এই দ্বন্দ্বের পরিণতি কী ?
পথ কুকুরদের নিরিখে শীর্ষে থাকা রাজ্যগুলি -

2023 সালের নভেম্বরে অ্যানিমাল হাজবেন্ডারি দফতরের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে 1 কোটি 53 লক্ষ 4 হাজার 345টি পথ কুকুর রয়েছে। যা দেশের জনসংখ্যার প্রায় 1 শতাংশ ৷

- তালিকায় শীর্ষে উত্তরপ্রদেশ ৷ যোগী রাজ্যে পথ কুকুরের সংখ্যা (20 লক্ষ 59 হাজার 261টি) ৷ ওড়িশা দ্বিতীয় স্থানে (17 লক্ষ 34 হাজার 399টি) ৷ মহারাষ্ট্র রয়েছে তৃতীয় স্থানে (12 লক্ষ 76 হাজার 399টি)। 4টি রাজ্যে যথাক্রমে রাজস্থান, কর্ণাটক, পশ্চিমবঙ্গ এবং মধ্যপ্রদেশে 12 লক্ষ ও 11 লক্ষেরও বেশি পথ কুকুর রয়েছে। 9 লক্ষ 31 হাজার 170টি কুকুর রয়েছে গুজরাতে ৷
- দিল্লিতে রয়েছে 55 হাজার 462টি পথকুকুর ৷ কলকাতায় রয়েছে 21 হাজার 146টি ও হায়দরাবাদে রয়েছে 10 হাজার 553টি কুকুর ৷ মিজোরামে সবচেয়ে কম, 69টি কুকুর আছে ৷ নাগাল্যান্ডে আছে 342টি কুকুর। তথ্য় অনুযায়ী, মণিপুর, দাদরা ও নগর হাভেলি এবং লাক্ষাদ্বীপে কোনও পথ কুকুর নেই ৷
পথ কুকুকের কামড়ে শীর্ষে যে রাজ্যগুলি-
কুকুরের কামড় ও তার জেরে গুরুতরভাবে আহত হওয়া এবং তার থেকে মৃত্যু-দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এখন এমন ঘটনা প্রায় প্রতিনিয়ত হয়ে চলেছে ৷ 2022 থেকে 2024 সালের মধ্যে, ভারতে কুকুরের কামড়ের মোট 89 লক্ষ 58 হাজার 143টি ঘটনা ঘটেছে ৷ 2022 সালে 21.8 লক্ষ পথকুকুরের কামড়ের খবর মিলেছে ৷ সেই সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে 2023 সালে এসে দাঁড়িয়েছে 30.5 লক্ষে ৷ রিপোর্ট বলছে, 2024 সালে সংখ্যাটা 37.1 লক্ষ ৷ অর্থাৎ 2022 থেকে 2024 পর্যন্ত পথ কুকুরের কামড়ের পরমাণ 45 শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

কুকুরের কামড়ের ক্ষেত্রে, মহারাষ্ট্র রয়েছে শীর্ষে ৷ এই তিন বছরের মধ্য়ে 13.5 লক্ষ কুকুর কামড়ের খবর মিলেছে ৷ তামিলনাড়ু রয়েছে দ্বিতীয়তে (12.8 লক্ষ) ৷ আর গুজরাত রয়েছে কুকুরের কামড়ের তালিকায় তৃতীয়তে (8.4 লক্ষ) ৷ আশ্চর্যজনকভাবে উত্তরপ্রদেশে কুকুরের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হলেও সেরাজ্য কুকুরের কামড়ের তালিকায় রয়েছে নবম স্থানে (5.45 লক্ষ) ৷ লাদাখ, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং আন্দামান ও নিকোবরে 10 হাজারেরও কম কুকুরের কামড়ের ঘটনা ঘটেছে ৷ যেখানে লাক্ষাদ্বীপই একমাত্র কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল যেখানে কোনও কুকুরের কামড়ের ঘটনা ঘটেনি।
জলাতঙ্কে মৃত্যুর হার -
জলাতঙ্ককে হাইড্রোফোবিয়া বলা হয়ে থাকে। কারণ আক্রান্ত রোগী জল দেখে, এমনকী জলের কথা মনে পড়লেও প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়ে । জলাতঙ্ক বা রেবিজ একটি মারাত্মক ও প্রাণঘাতী রোগ ৷ চিকিৎসা শাস্ত্র বলছে, জলাতঙ্ক হল ব়্যাবিস ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট একটি ভাইরাল সংক্রমণ। এই রোগ প্রাথমিকভাবে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে প্রভাবিত করে। ভাইরাসটি সাধারণত একটি সংক্রমিত প্রাণীর লালার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত কুকুরের কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে জলাতঙ্ক ছড়ায়। জলাতঙ্ক দ্বারা সংক্রামিত হতে পারে এমন কোনও প্রাণী কামড়ালে বা আঁচড় দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার। নইলে প্রাণহানিও হতে পারে।

আমেরিকান সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের মতে, জলাতঙ্কে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে 59 হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। একটি সরকারি প্রতিবেদন অনুসারে, ভারতে 2022-24 সালের মধ্যে তিন বছরের মধ্যে, মোট 125 জন জলাতঙ্ক আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন। এই তালিকাতেও মহারাষ্ট্র শীর্ষে রয়েছে ৷ 2022 সালে 7 জন, 2023 সালে 14 জন এবং 2024 সালে 24 জন অর্থাৎ 35 জন জলাতঙ্ক রোগে মারা গিয়েছে ৷ কর্ণাটকে 12 জনের জলাতঙ্কের কারণে মৃত্যু হয়েছে ৷ এর পড়ে রয়েছে মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ এবং তামিলনাড়ু ৷ এই রাজ্যগুলিতে 9 জন করে ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, 9টি রাজ্য এবং 5টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে একই সময়ে জলাতঙ্ক রোগে মৃত্যু শূন্য ৷

